বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস: একটি পর্যলোচনা- ড. আবদুল আলীম তালুকদার

Views
Charu Barta24 । । চারু বার্তা ২৪

প্রতি বছর ১১ জুলাই পৃথিবী জুড়ে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়, যার লক্ষ্য বিশ্ব জনসংখ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ও তার প্রতিকারের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই তারিখে বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি পূর্ণ হওয়ার পর ৯০ দেশের সরকারি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি সভায় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তখন সারা বিশ্বের জনমানুষের মধ্যে যে আগ্রহের সৃষ্টি হয়, তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে। ইউএনডিপি’র গভর্ন্যান্স কাউন্সিল কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাব জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অতি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপিত হয়। এরপর থেকে জনসংখ্যা সমস্যার গুরুত্ব ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন চিন্তা করে প্রতিবছর সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণের মাধ্যমে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূললক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো পরিবার পরিকল্পনা, লৈঙ্গিক সমতা, দারিদ্র্য, মাতৃস্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের মতো জনসংখ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বিষয়ক নানাবিধ সমস্যাগুলো সকলকে অবহিতকরণ এবং তা গুরুত্ব অনুসারে সমাধান করা। একটি রাষ্ট্রের যে কয়েকটি মৌলিক উপাদান রয়েছে তার মধ্যে জনসংখ্যা অন্যতম। আর এই জনসংখ্যা কোনো দেশের জন্য সম্পদ আবার কোনো দেশের জন্য বোঝা। অনেক দেশে অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনায় না এনে তাদেরকে বোঝা হিসেবে বিবেচনায় নেয়। তবে সমসাময়িক প্রযুক্তি, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অতিরিক্ত জনসংখ্যা দক্ষতা সম্পন্ন করতে পারলে তা সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় অপুষ্টি, বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতার মূলে রয়েছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা। আর এসব বিষয়কে সামনে রেখে অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা করা ইহলো দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য।
জনসংখ্যা যে কোনো দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও ঐশ্বর্যের প্রধান নিয়ামক শক্তি। এ জনসংখ্যাকে কাম্য জনসংখ্যায় পরিণত করতে পরিকল্পিত পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিকল্পিত জনসংখ্যা, খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার পূরণের পাশাপাশি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের আয়তন, অবস্থান, জনসংখ্যা, প্রাকৃতিকসম্পদ, পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের বিকল্প নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) হিসাবমতে, প্রতি মিনিটে বিশ্বে ২৫০টি শিশু জন্মগ্রহণ করে। জাতিসংঘ জনসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ সংখ্যা অনেক বেশি। কিউবা, ব্রাজিল, চিলি, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সন্তান জন্মদানের বিষয়টিকে আলাদা অনুভূতির দৃষ্টিতে দেখায় হিতে বিপরীত হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ১৯৯৪ সালে যেখানে মাত্র ১৫ শতাংশ নারী আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করতো বর্তমানে তা বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশে এ হার বর্তমানে ৬৩.৬ শতাংশ। ২০০৪ সালে এ হারছিল ৩.২০ শতাংশ। ২৫ বছর আগে স্বল্প আয়ের দেশে একজন নারী কমপক্ষে ৬টি সন্তান জন্ম দিতো। বর্তমানে তা ৪ এর নীচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে এ হার বর্তমানে ২.৫ শতাংশ।
ইউএনএফপিএ-র বার্ষিক বৈশ্বিক জনসংখ্যা প্রতিবেদন- এ বলা হয়েছে, বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ। বছরে ১.২ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮১ লাখ আর মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে আমাদের লোকসংখ্যা ২৩ কোটি অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জনসংখ্যা সমস্যা নিয়ে কিছুটা বিতর্কও আছে। অনেকের মতে পৃথিবীতে যা সম্পদ রয়েছে তাতে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ কোটি লোকের স্বাচ্ছন্দ মতো বসবাস করার উপযোগী। তাদের মতে ধীরে ধীরে পৃথিবীর সকল দেশের জনসংখ্যা কমিয়ে আনা উচিত। কেবল মাত্র এ পদ্ধতি গ্রহণ করে প্রকৃতির ওপর যে নির্যাতন চলছে তা বন্ধ করা সম্ভব। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নত বন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে। জনসংখ্যা সমস্যায় জর্জরিতগণ চীন সরকার এক সন্তান নীতির মাধ্যমে জনসংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আবার কিছু দেশ ঋণাত্মক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের কারণে উল্টো নীতিও গ্রহণ করেছে।
ইউএনএফপিএ-র তথ্য মতে, ১০০০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ছিল ৪০ কোটি। ৭৫০ বছরে তা দ্বিগুণ হয়। এরপর থেকে জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। ১০০ বছরেদ্বিগুণ, বর্তমানে মাত্র ৫০ বছরে দ্বি-গুণিতক হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। এমনকি জনবিস্ফোরণের অবস্থা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে এই অতিসহনশীল বসুন্ধরা।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৭০ কোটিতে পৌঁছে। এটি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালে ৮৫০ কোটি, ২০৫০ সালে ৯৭০ কোটি এবং ২১০০ সালে গিয়ে১০৯০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে জাতি সংঘ অনুমান করছে। ২০৫০ সালের মধ্যে যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, তার অর্ধেকের বেশি বৃদ্ধি পাবে ৯টি দেশে; এগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইথিওপিয়া, কঙ্গো, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা খুব বেশি আগের নয়। মূলত: কৃষি বিপ্লবই জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এর পূর্বেকারসময়খাদ্যাভাবপরোক্ষভাবেজনসংখ্যাকেনিয়ন্ত্রণকরেছে।

তবে আশার কথা হলো, উন্নয়ন শীল দেশ গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশে ১৯৭০ সাল থেকে প্রজনন হার কমতে থাকার বিপরীতে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। মা ও শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার সুফল ভোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম। মা ও শিশু সুরক্ষা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে উল্লেখযোগ্য ভাবে সক্ষম হওয়ায় ২০১০ সালে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্তমান গতিতে জন্মহার বাড়তে থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১০০০ কোটিতে আর চলতি শতাব্দীর শেষনাগাদ ২১০০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ১১০০ কোটিতে। পৃথিবীর সীমিত সম্পদের যতই সুষম বন্টন করা হোক না কেন তা নানা কারণে দিন কে দিন হ্রাস পাচ্ছে। মানবকুলের জন্য বড় বিপর্যয় হচ্ছে মাটি-পানি-বায়ু দূষণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার-অপব্যবহার ও গ্রীনহাউস এফেক্ট। প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়ার জন্য জন সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যতই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উদ্যোগ গ্রহণকরা হোক না কেন মানুষের খাদ্য চাহিদার জোগান দিতে গিয়ে প্রকৃতি কিন্তু ক্রমেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে এবং মানব বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘন বসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এবং শহর কেন্দ্রিক জনস্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ব্যবস্থা আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নগরায়ন, নির্বিচারে বন ভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট দুর্যোগ। সেই সাথে বিশ্বজুড়ে জাতিগত দ্বন্দ্ব-বিবাদ, পেশি শক্তি প্রদর্শনে মানব সভ্যতার জন্য হুমকি নানান মারণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার এবং নানা কারণে বাস্তুচ্যুতি ও জোরপূর্বক অভিবাসন তো রয়েছেই। এসব দুর্যোগ ও দ্বন্দ্বে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আর অপুষ্টি, মাদকের সহজ লভ্যতা ও তরুণ-যুবসমাজের উপর এর করাল থাবা এবং শব্দদূষণ তো এখন প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

ইউএনএফপিএ’র আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৫০ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ শহরের বাসিন্দা হবে। কেননা খাদ্য চাহিদা ও জীবনযাত্রার মান পর্যায়ক্রমে ক্রমাবনতির ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত শহরাভিমুখী হচ্ছে। বিগত শতাব্দীতেও সারা পৃথিবীতে জনবহুল শহর ছিল মাত্র ১২ টি; যেখানে প্রতিটিতে গড়ে বাস করতো ১০ লাখের মত মানুষ। বর্তমান এক বিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বে জনবহুল শহরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০০টিরও বেশি; যেখানে গড়ে ১৫ লক্ষের অধিক মানুষ বসবাস করছে। আর কোটির উপরে লোক বসবাস করছে এমন শহরের সংখ্যা পৃথিবীতে এখন ১৯ টিরও বেশি।

দেশ, রাষ্ট্র আর নিখিল বিশ্বের অন্যতম মূল উপাদান হল জনসংখ্যা। এ জনসংখ্যাকে পরিকল্পিত ভাবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশল ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পৃথিবীর মোট সম্পদ যেহেতু বাড়ছে না; দিনকেদিন বরং কমছে, তাই মানবমণ্ডলীর সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববাসীকে আরো আন্তরিকও সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: ড. আবদুল আলীম তালুকদার – কবি, শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক।

Charu Barta24 । । চারু বার্তা ২৪

মন্তব্য করুন