যে কারণে আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর দীর্ঘস্থায়ী না হওয়া ও এর প্রতিকারের উপায়

Views
Charu Barta24 । । চারু বার্তা ২৪

মোঃ মেরাজ উদ্দিন :
দেশের বিরাট একটি অংশের মানুষের নেই কোন জমি, থাকার জন্য নেই একটি আশ্রয়স্থল। যে কারণে অনেক কষ্টেই চলছে তাদের জীবন। এ বিষয়টি দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাছিনা অনুভব করতে পেরেছেন। শুধু বুঝতেই পারেননি। তাদের দুঃখ লাঘবের জন্য ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন। ঘোষনা দিয়েছেন ‘মুজিব শতবর্ষে বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’। শুধু ঘোষনা না তা দ্রুত বাস্তবায়নও করছেন। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। শেরপুর জেলায় এ পর্যন্ত ৪৫৮টি ভূমিহীন পরিবারকে প্রদান করা হয়েছে দুই শতক করে জমি আর একটি করে আধা পাকা ঘর। প্রতিটি ঘর নির্মানে ব্যয় ধরা হয়েছে ১লাখ ৯০ হাজার করে টাকা।
ইতিমধ্যে দুদফায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে ঘরগুলো উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন। আমরা সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলায় ঘুরেঘুরে জমি ও ঘর পাওয়া মানুষগুলোর অনুভূতি জেনেছি। তারা দীর্ঘদিন পর আপন ঠিকানায় আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপহার পেয়ে খুশিতে অঝুরে কেঁদেছেন। তাদের মধ্যে জমে থাকা দুঃখ-কষ্টগুলো দীর্ঘদিন পর পাওয়ার খুশিতে প্রকাশ করেছেন চোখের জলে। তারা প্রাণ খুলে দোয়া করেছেন প্রধানমন্ত্রীকে।
কিন্তু কিছু ক্রটি থাকায় তাদের স্বপ্নের ঘরগুলো দ্রুতই ক্ষতি হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্পটি একটি চলমান কার্যক্রম। এ মূহুর্তে বিষয়টির দিকে নজর না দিলে তা শেষে গিয়ে কিছু করার থাকবে না। ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ গত বছর থেকে শুরু হয়। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার ভূমিহীন, গৃহহীনদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে শেরপুর জেলাতে প্রায় ৪৫৮টি ঘর নির্মাণক্রমে যথাযথভাবে সংশ্লিষ্টদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
হস্তান্তরের পর, দেশের কিছু কিছু জেলা ও উপজেলায় সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি এবং বন্যাজনিত কারণে নির্মিত ঘরগুলির মধ্যে কিছু কিছু ঘর ধ্বসে গেছে ও ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে দেখা দিয়ছে বিভ্রান্তি। মাঠ পর্যায়েও জেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্মাণের সাথে জড়িত অনেক কর্মকর্তার চাকুরী হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
তবে শেরপুর জেলার ভূমিহীন ও ঘরহীন ব্যক্তিদের জন্য ঘর নির্মাণের জন্য যে খাস জমিগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে তা এ জেলার খাসজমির মধ্যে উৎকৃষ্ট মানের বিধায় শেরপুর জেলায় নির্মিত ঘরগুলির তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ভবিষ্যতে নির্মিতব্য ঘরগুলি কতদিন টিকে থাকবে বা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।
এ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে এবং জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ঘর নির্মাণ ও পরিদর্শনের সাথে জড়িত সরকারী কর্মকর্তা এবং জনপ্রতিনিধিগণের সাথে কথা বলে নানা বিষয় ওঠে আসে। যার কিছুটা তুলে ধরা হচ্ছে।
এ প্রকল্পের ঘর তৈরির জন্য যে উপাদান ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। ঘরের মেঝে ও পিলারে রডের ব্যবহার রাখা হয়নি। শুধু ইট, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে ঘর তৈরি করলে সেই ঘরে ফাটল ধরাটাই স্বাভাবিক। ঘরের জন্য বালু ও সিমেন্টের মিশ্রণ যে অনুপাত রাখা হয়েছিল, তা-ও বাস্তবসম্মত ছিল না। এছাড়াও ঘরগুলোতে রিনটেল দেয়া হয়নি। হস্তান্তর করা ঘরগুলোতে ফাটল ধরার এটিও একটি অন্যতম কারণ। ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঘরের মেঝে ও দেয়াল নির্মাণের পর পানি দিয়ে ২১ থেকে ২৮ দিন ভিজিয়ে রাখার সময় পাওয়া যায়নি। আর নতুন জমিতে তাড়াহুড়া করে ঘর করতে হয়েছে। এতে মাটি ঠিকমতো বসেনি/কম্প্যাক্ট হয়নি। ফলে ঘরের মেঝে এবং দেয়ালে ফাটল সৃষ্টির আরেকটি কারণ বলে আমি মনে করি। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা খাসজমিগুলো অবৈধ দখল উচ্ছেদক্রমে সে জমি দখলে নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। জমি বুঝে নিতে দেরি হওয়ায় ঘর নির্মান কাজ শেষ করতে সময় পাওয়া গেছে কম। আর দ্রুত ঘর নির্মান করতে গিয়েও কাজগুলো সঠিকভাবে করা যায়নি।
অপেক্ষাকৃত নিচু খাসজমি উদ্ধার করে মাটি ভরাটক্রমে মাটি ঠিকমতো বসার/ কম্প্যাক্ট হওয়ার আগেই ঘর তৈরি করায় বিভিন্ন জায়গায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এমনকি ভবিষ্যতেও ঘরগুলি সামান্য ভূমিকম্পে ধ্বসে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে শেরপুর জেলা পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্পের সম্মুখীন হয়। ভূমিকম্পের অতিঝুঁকিপূর্ন এলাকার মধ্যে শেরপুর জেলা একটি। এছাড়া এ জেলায় প্রতিবছরে একাধিকবার বন্যা ও পাহাড়ী ঢলের পানিতে বন্যা হয়ে থাকে।
সেক্ষেত্রে বর্তমানে অবশিষ্ট নিম্নাঞ্চলে অবস্থিত খাসজমিতে ঘর নির্মাণ করার ক্ষেত্রে প্রথমেই মাটি ভরাটক্রমে নিচু জমি উঁচু করার ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জমি কম্প্যাক্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেয়া ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি তা না করা যায় সেক্ষেত্রে যথাযথ ফাউন্ডেশন/প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আরসিসি ফাউন্ডেশন, কমপক্ষে ৪টি আরসিসি পিলার, লিনটেল সমৃদ্ধ ঘর নির্মাণ করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া টিনের চালে কাঠের বাতা ব্যবহারের পরিবর্তে লোহার এঙ্গেল ব্যবহার করা প্রয়োজন। কারণ সঠিক সার বিশিষ্ট কাঠ ব্যবহার না করলে তাতে ঘুণ লাগতে পারে। আর এর জন্য ঘর নির্মানের ব্যয় বৃদ্ধি করা প্রয়ােজন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলির সাসটেইনেবল হওয়ার স্বার্থে নির্মিতব্য ঘরের লে-আউট ডিজাইন সংশোধনক্রমে সে মোতাবেক প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করে যথাযথভাবে ঘর নির্মান করলেই তা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সৎ উদ্দেশ্য শতভাগ সফল হবে।

Charu Barta24 । । চারু বার্তা ২৪

মন্তব্য করুন