হিমালয়কন্যা নেপালের পথেঘাটে- ৪

Views
Charu Barta24 । । চারু বার্তা ২৪

 

ড. আবদুল আলীম তালুকদার
(পূর্ব প্রকাশের পর) হিমালয় দুহিতা পোখরা উপত্যকাটি অত্যন্ত পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন, শান্ত-সুনিবিড় ও অনেকটা কোলাহলমুক্ত, ঘর-বাড়িগুলোও অনেকটা গোছানো। রাস্তাঘাটগুলো তেমন প্রশস্ত না হলেও পাহাড়ের উপত্যকার শহর বলে রাস্তাগুলো কখনও উঁচু কখনও নীচু। রাস্তার প্রায় প্রতিটি মোড়ে এবং রাস্তার দু’পাশে প্রায়ই ছোট-বড় এবং কোথাও কোথাও ঝুড়িওয়ালা বিশাল জোড়া বটবৃক্ষ আমাদের নজর কেড়েছে। কথা প্রসঙ্গে এক নেপালীর কাছ থেকে এই জোড়া বটবৃক্ষগুলোর রহস্য জেনেছি। তাদের মতে, তারা বছরের বিভিন্ন সময় এই জোড়া বটবৃক্ষগুলোর পূজা-অর্চনা করে থাকে এবং অনেক ধুমধামের সাথে অনুষ্ঠানাদি করে এই জোড়া বটগাছের বিবাহ সম্পাদন করে থাকে।
যাহোক এই পোখরা শহরটি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ২০৩ কি. মি পশ্চিমে অবস্থিত যা নেপালের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পোখরা শহরকে ‘নেপালের ভূ-স্বর্গ’ ও ‘নেপাল রাণী’ বলা হয়। এছাড়াও অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য পোখরাকে প্রকৃতির দান বলা হয়। পোখরা শহরের উত্তর দিকটা সবুজ ও বরফ ঢাকা পাহাড়ে ঘেরা। পোখরা এমন একটি শহর যে শহরে কয়েকটি ছোট নদীর উৎপত্তি এবং নদীগুলো শহরের মাঝে প্রবাহিত হয়ে লেকে বিলীন হয়েছে। এখানকার আবহাওয়া চমৎকার যা পর্যটকদের অত্যন্ত আকর্ষিত করে। নেপাল পর্যটন বিভাগের একটি স্লোগান আছে, ‘তোমার নেপাল দেখা পূর্ণ হবে না, যদি না তুমি পোখরা দেখ’। পোখরা থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম (১৪০ কি. মি) সারিবদ্ধ হিমালয়ের পাহাড়ের সারি অনেকটা স্পষ্টই দেখা যায়। পোখরাকে ‘মাউন্টেন ভিউ’ এর শহরও বলা হয়। এখান থেকে অন্নপূর্ণা ও মাছের লেজের মতো দেখতে মচ্ছ পুচ্ছরে (৬৯৭৭ মিটার) পর্বতশৃঙ্গ দেখা যায়, যা বিশ্বখ্যাত চারটি পর্বতশৃঙ্গের একটি। এই পোখরাতেই আছে অনেক দর্শনীয় স্থান। আকাশ পরিস্কার থাকলে পোখরা থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতও খুব সুন্দর ও স্পষ্ট দেখা যায়।
যেদিকে চোখ যায় সেদিকে শুধু সবুজের সমারোহ্। মাঝে মাঝে অসংখ্য ছোট বড় পাহাড় মাথা উঁচিয়ে আছে। এই পাহাড়ি উপত্যকাটি মনোরম লেকের জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও রয়েছে নামজাদা বরফমোড়া শৃঙ্গের হাতছানি। সারা পৃথিবীর দশটা শৃঙ্গের আটটি শৃঙ্গই নেপালে। সেই কারণে সারা বছর পর্যটকরা বারে বারে ছুটে আসেন নেপালে। এখান থেকেই হিমালয় চূড়া দেখা মিলবে। পোখরা ভ্যালির অপরূপ সৌন্দর্য যেন কোনো চিত্রপটে আঁকা ছবি। পূর্ণিমা রাতের ভরা জোৎ¯œায় গোটা উপত্যকা এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে। সমস্ত নীরবতা ছিন্নভিন্ন করে পুরো উপত্যকা যেন এক মায়াবি আলোর খেলায় মেতে ওঠে।

পরের দিন পোখরার হোটেল গ্লোবাল ইন থেকে খুব ভোরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সারাংকোট পরিদর্শন করার জন্য। সেজন্য নাস্তাপর্ব সেরে একটি জীপ গাড়ি ভাড়া করে সারাংকোটের পথে পা বাড়ালাম। পোখরার সারাংকোট পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে পর্বতমালার অপূর্ব দৃশ্য, পোখরা ভ্যালী ও ফেওয়া লেক দেখা যায়। সারাংকোট যাওয়ার পথে এ সময় পাহাড়ি পথে চোখে পড়লো ছোট ছোট বেশ কয়েকটি গ্রাম। বিভিন্ন সময় রাস্তার শেষ বাঁকের মারাত্মক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় আপার সারাংকোটের ভিউ পয়েন্টে। সারাংকোট পোখরা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫৯২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত; এটি একটি পর্বত চূড়া। এটি পোখারার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বর্তমানে স্থানটি পর্যটকদের এক প্রধান গন্তব্যস্থলে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে পৃথিবীর সুন্দরতম সূর্যোদয় দেখা যায়। পোখরায় আসা কোনো দর্শনার্থীই সারাংকোটে প্রথম সূর্যোদয় দেখার লোভ সামলাতে পারেন না। কেননা ১৫৫২ মিটার উচ্চতায় হাড় কাঁপানো হিমেল হাওয়ার দাপটকে সহ্য করে সামনে বিস্তীর্ণ প্রকৃতির ক্যানভাসে সকলেই অপেক্ষারত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। এখানে পর্যটকেরা মূলত: আসে পর্বতশৃঙ্গে সূর্যের প্রথম আলোর বর্ণালী ছটা দেখতে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সারাংকোট থেকে একদিকে নতুন সূর্য, আরেকদিকে অন্নপূর্ণা, ফিস টেইল, ধুলাগিরি, গণেশ, মানাসলুউ’র সর্ব্বোচ্চ শিখরের চমৎকার দর্শন পাওয়া যায়; সে এক অভুতপূর্ব দৃশ্য। সূর্য ওঠার অনেক আগেই এই স্থানে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। কেননা ভোরে সূর্যের প্রতিটি রশ্মির কণা ঠিক্রে পড়ছে অন্নপূর্ণার পাঁচটি শিখরের শরীরে। সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই কমলা, হলুদ রঙে রাঙাতে শুরু করে ধবধবে সাদা অন্নপূর্ণা। হিমালয়ের কোলে এ রকম সূর্যোদয় দেখা ভ্রমণার্থীদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পোখরা থেকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের বিপদসঙ্কুল অবস্থার মধ্য দিয়ে মিনিট ত্রিশের পথ পেরিয়ে চলে যাওয়া যায় লোয়ার সারাংকোটে। এরপর প্রকৃতির বুকে প্রায় ৩ কি. মি ট্রেক করে আমরা আপার সারাংকোটে যেতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেখানে পৌঁছার পর আমাদের যে কী ভালো লাগা কাজ করেছিল তা বলে শেষ করা যাবে না।
চিত্র: ওয়ার্ল্ড পিচ প্যাগোডা, নেপাল
সারাংকোটের আর একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় ইভেন্ট হলো প্যারাগ্লাইডিং লঞ্চিং পয়েন্ট। এখানে নানা রঙের বিশাল পাখির মতো ডানায় ভর করে প্যারাগ্লাইডাররা আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে ফেলেন। প্যারাগ্লাইডিং করে ফেওয়া লেকের উপর দিয়ে উড়ে বেড়ানোর সময় পুরো পোখারা উপত্যকাটি খুব সুন্দরভাবে দেখতে পাওয়া যায়। পোখারায় আটটি অনবদ্য লেক রয়েছে। ফেওয়া লেক, বেগনাস লেক তার মধ্যে অন্যতম। তারপর আমরা অন্নপূর্ণা রেঞ্জে অবস্থিত সারাংকোটের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড পিচ প্যাগোডা পরিদর্শন করলাম। সাদা ধবধবে মার্বেল পাথরে তৈরি পিচ প্যাগোডা বিশ্বের অন্যতম উচ্চতা সম্পন্ন পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত একটি বৌদ্ধ উপাসনালয়। পিচ প্যাগোডার কাঠামোগত সৌন্দর্য এবং সবুজ-শ্যামলীমা পাহাড় আমাদের মনকে ক্ষণিকের জন্য হলেও দোলা দিয়েছিল। (চলবে)
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সহ. অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

Charu Barta24 । । চারু বার্তা ২৪

মন্তব্য করুন